কাল্পনিক এক ভালোবাসার গল্প
ফেসবুকে টুকটাক লেখালেখি করতাম। বলতে গেলে একদম আনাড়ি টাইপের লেখা। ছেলেদের কাঁদতে নেই, তবুও জীবনে দুবার কেঁদেছিলাম। যেটাকে গুমড়িয়ে গুমড়িয়ে কান্না বলে। প্রথমত, প্রথম ফেসবুক আইডি হারিয়ে। আর দ্বিতীয়টা, আজ যার জন্য এই লেখাটা, তার জন্য।
মানুষের জীবনে প্রেম ধরা দেয়, শৈশব অথবা কিশোর বয়সে। আমার বেলা তার উল্টা। আমার শৈশবে প্রেম আসেনি। স্কুল, বিদ্যালয়, কলেজ কিংবা ভার্সিটিতেও আসেনি। যখন আসলো তখন আমি, তেইর বছরের। খুব অদ্ভূত ভাবে। কোন এক গল্পের প্লট থেকে নেমে আশা কল্পময়ী রুপে। উঁহু, এত সহজ ছিলো না প্রেমটা। মুনের অশ্রু নামে একটা ধারাবাহিক গল্প লিখছিলাম। যেহেতু ধারাবাহিক গল্প ছিলো, তাই কোন পর্বে তার কমেন্ট। পুরো কমেন্টস বক্স জুড়ে তার কমেন্টসটাই ছিলো অন্যরকম। যেখানে, গুণীদের কদর হয় না, সেখানে গুণীরা জন্মায় না। কথা তার কমেন্টসে দারুন ভাবে ফুটিয়ে তুলে ছিলো। কোন কমেন্টসের রিপলে না দাওয়া আমি তার কমেন্টসের রিপলে দিয়ে বসলাম। কমেন্টসের রিপলে বাড়তে থাকলো। কমেন্টস পেরিয়ে সে হুট করে এসে ঢুকে পড়লো লিষ্টে। পুরো গল্পটায় রোমাঞ্চে টইটুম্বুর করছিলো। পাঠকরা ধরেই নিয়েছিলো এন্ডিংটাও অনেক রোমাঞ্চময় হবে। পৃথিবীতে দুটো জিনিস একদম বিশ্বাস করতে নেই। প্রথমটা, লেখকদের। আর দ্বিতীয়টা, যে মহয়সী একবার সব ত্যাগ করে চলে যায়, তার প্রস্থান। গল্পের এন্ডিংটা অনেক দুঃখের ছিলো। এত দুঃখ যে, মেসেজে দু'চার জন পাঠিকা শাসিয়ে দেয়। এমন এন্ডিং দিলে, লেখককে গুম করে দিবে। তবে, আমার অবাঞ্চিত মন কারো মেসেজের হা হুতাশ করছে। সেই কাঙ্খিত মেসেজ এলো। তখন রাতের মধ্যভাগ শেষ। তবে, সে অন্য সবার মত শাসায়নি। মৃদু করে বলেছিলো..
-লেখক কি ছ্যাকা খেয়েছিলো আগে? তা নাহলে লেখক পাঠকদের আবেগ নিয়ে খেলতে ভালবাসে। সত্যি, প্রত্যেকটা লেখকই পাঠকদের আবেগ নিয়ে খেলতে ভালবাসে। লেখকদেরই বা দোষ কি? আমরা যে বড্ড আবেগী জাতি। আমাদের বাস্তবে টানে না। পেটের খোরাক না থাকুক, আবেগ থাকা চাই!
এভাবে আস্তে আস্তে তার সাথে চ্যাটিং বাড়ে, রাত বাড়ে। রাত ফুরায়, দিন গড়ায়। আবার রাত হয়। আমাদের কথা ফুরায় না। ঠিক ভালবাসা হয়েও হয় না। এত কথা বলা হয় আসল, কথাই বলা হয় না।
যেহেতু, আগে প্রেম-ভালবাসা টানেনি। তাই এটা বুঝেও বুঝতে পারি না। সত্যিকারের প্রেমকে আবেগ, আর আবেগকে প্রেম মনে হয়। বাস্তবেও জিবনও তাই। আমরা সর্বদা ভুল মানুষের প্রেম পড়ি।
আমরা অনেক ভাল বন্ধু হয়ে যাই। আমি তার কন্ঠের, সে আমার গল্পের। প্রতিরাতে তাকে নতুন নতুন গল্প পড়ে শুনাতাম। সে শান্ত দিঘীর জলের মত শুনত আমার আবৃত্তি। মাঝে মাঝে বলে বসতো..
-কবিতা আবৃতি হয় জানতাম। গল্পও যে আবৃত্তি হয়, তাও এত দারুন ভাবে তা তো জানতাম না।
যেহেতু, একই শহরে ছিলাম। দূরত্বটা ছিলো বেশ তাই দেখা হত না। এমনকি সে কখনও আমাকে দেখতে চায়নি। আমিও তাকে। হুট করে একটি বলে বসি, ইরা চলো আমরা দেখা করি।
ইরা, কোন কথা বলেনি। লাইনটাও কাটেনি! চুপ করে থেকে ছিলো কয়েক মূহুর্ত, কয়েক মিনিট। এই কয়েক মিনিটেই মনে হয়েছে আমি ইরাকে ভালবাসি। অনেক বেশী ভালবাসি। তার এই কয়েক মিনিট নিরবতা আমার মনে ঝড় তুলেছিলো, কাল বৈশাখী ঝড়। তাকে হারিয়ে ফেলার ভয়ে না, তার স্বচ্ছ জলের ঝর্নাধারার মত কন্ঠ না শোনার ভয়ে। নিরবতা ভেঙ্গে নয়নাই বলেছিলো..
-নেভী ব্লু পান্জাবী আছে?
-নাহ, নেই।
-কাল সকালে কিনে নিবেন। আর একটা বিকাশের দোকান থেকে নাম্বার দিবেন আমায়।
আশ্চর্য হলেও সত্য আমার নাম্বার ইরার কাছে ছিলো না, ইরাও নাম্বার আমার কাছে নাই। আমাদের কথা হত, ম্যাসেন্জারে। আমরা কথা বলতাম, আইফ্রেল টাওয়ার গড়ার কথা, তাজমহল গড়ার কথা, ইউসুফ-জুলেখার কথা, মুহাম্মদ (সঃ)-খাদিজা, আয়শার কথা। আমরা কোন টপিক কোথায় গিয়ে থেমে যেত, জানতাম না। সত্যি জানতাম না। ক্রমশই, এই মেয়ের মায়ার পড়ছিলাম আমি। এই মায়া কাটা দায়, বড্ড দায়। আমার খুব করে মনে আছে, একবার ইরা তিনদিন অফলাইনে ছিলো। ঠিক সেই তিনদিনই আমার জ্বর ছিলো, গা পুড়ে যাওয়া জ্বর। অসহ্য মাথা ব্যাথা, ব্যাথায় কাঁকড়াতে কাঁকড়াতে বমি করি। মুখ ফুরে বমি। তিনদিনে আমি একদলা খাবার মুখে তুলতে পারিনি। মনে হচ্ছিলো আমি মারা যাচ্ছি। আস্তে আস্তে মৃত্যু নামক বাহনটা আমার কাছে আসছে। খুব ইচ্ছা করছিলো ইরার সাথে একটু কথা বলি। ইরা যে বড্ড রহস্যময়ী তাই তার কন্টাক্ট নাম্বার দেয়নি আমায়। অথচ, তিনদিনের খুদা, দূর্বিসহ্য মাথা ব্যাথা, গা পুড়ে যাওয়া জ্বর নিমিষেই ভাল হয়ে যায় ইরাকে অনলাইনে দেখে।
সকাল নয়টা। খন্দকার টাওয়ারে বিকাশের দোকানের সামনে দাড়িয়ে আছি। ইরা নাম্বার নিয়েছে। টাকা দেবে। আমি মানা করলে বলতো, আমাকে আপনি বন্ধু ভাবেন না তাই তো। নিতে হবে না আমার টাকা। অপারক আমি ইরার দেওয়া টাকা নিয়ে খন্দকার টাওয়ারে ঢুকি। অনেক খুঁজে নেভী ব্লু পান্জাবি না পেয়ে ইরাকে নক্ দেই। ইরা তাচ্ছিলো মেরে বলে..
-আপনি কিসের লেখক? এত ভাল গল্প লেখেন অথচ, নেভী ব্লু কালার চিনেন না? চিনেনটা কি?
ইরার পছন্দে পান্জাবি নেই, তাও পান্জাবি লাইনে করে ছবি তুলো ইরাকে দাওয়ার পর। ইরা ই বলে দিয়েছিলো কোনটা নিতে হবে।
৩১ ডিসেম্বর ২০১৭। দুপুর দুইটা। ধর্মসাগরপাড়ে দাড়িয়ে আছি। নাটক, গল্প সবখানে দেখে, পড়ে এসেছি মেয়েরা আগে আসে ছেলেরা পরে। আমার ক্ষেত্রে
হয়েছিলো উল্টা। ইরা পাক্কা এক ঘন্টা লেট করে আসে। তখন আমি বিরক্তি'র চরম শিখরে। ইরা মেসেজ করে সে ধর্মসাগর পাড়ে। আগে কখনও ইরাকে দেখিনি। আর ইরা এখন নাকি পড়ে আছে নেভী ব্লু ম্যাচিং করে বোরকা আর হিজাব। আমার ইরাকে চিনতে হয়নি, ইরা ই আমাকে চিনে নেয়। ইরা আমি ধর্মসাগর পাড়ের এগলি দিয়ে ঢুকে শিশু পার্কের গলি দিয়ে বেরিয়ে যাই। ইরা আমাকে নিয়ে পুরো শহর ঘুরবে আজ। রিক্সায় উঠে আমাকে উঠতে বলে। আজকাল শহরের রিক্সাগুলো কাপলদের জন্য সুখ্যকর। আমার মত আধা ঝোলাদের জন্য অনুতাপের। ইরা রিক্সায় বসার পর যে জায়গাটুকু আছে তাতে একটা ছোট বাচ্চাকে বসানো যাবে। আমি উঠলে ইরার শরীর আমার শরীর মেখে একাকার হয়ে যাবে। অথচ, ইরা আগেই বলেছে তাকে, তার আঙুল কিংবা হাত ভুলেও যেন স্পর্শ করা চেষ্টা করি। আমার এমন মূর্তিয়মান দাড়িয়ে থাকা দেখে ইরা বলে..
-এতটুকুন ছাড় দাওয়া যেতে পারে। তার বাহিরে কিছু না।
বারফি রেস্টুরেন্টেরর সামনে যেতেই ইরা বলে, তার খুব খিদা লাগছে। দুপুরের তাড়াহুড়োয় খেয়ে আসেনি। রিক্সা থামিয়ে ইরা বারফিতে ঢুকে পড়ে। মাসের শেষ টানাটানিতে আছি। ছোট একটা চাকরি করলেও মাসের আট তারিখের আগে সেলারী অসম্ভব। রুমমেটের থেকে দুশো টাকা ধার নিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু বারফির মেন্যু দেখে, রীতিময় কালো ঘাম ছুটছিলো। ইরা মেন্যু উল্টে দুই প্লেট বিরিয়ানি আনতে বলে। আঁড় চোখে দেখে নিয়েছি প্লেট ১৬০টাকা। তারমানে দু'প্লেট ৩২০ টাকা। আমার কাছে সব মিলিয়ে ২৫০ টাকা হবে। বাকি ৭০টাকাই এখন গলার কাঁটা।
লজ্জায়, চিন্তায় বিরিয়ানি আমার গলা দিয়ে নামে না। ভিতর থেকে নাড়া দিয়ে উঠছে, রাব্বি আজ তোর উজ্জতের ফালুদা বাজবে!
ইরা আয়েশ করে বিরিয়ানি শেষ করে লাচ্ছি অর্ডার করে। এবার আমার ধম আটকে যাবার উপক্রম। ৭০টাকার বিনিময় না হয় হাতের ঘড়িটা দেয়া যেত। এবার মোবাইলটাই দিতে হবে।
বিল নিয়ে দাড়িয়ে আছে ওয়েটার। আমতা আমতা করে পকেটে হাত দিতেই ইরা, পাঁচশো টাকার একটা নোট বাড়িয়ে দেয় ওয়েটারের দিকে। আমি লজ্জামাখা কন্ঠে বলি..
-আমি দিচ্ছি।
ইরা ভ্রুকুঁচকে তাকিয়ে বলে, তাই!
আমি কিছু বলতে পারি না। মনে মনে বলি..
-হে ধরণী দ্বিধা হও, আমি তোমার ভিতরে প্রবেশ করি।
-লেখক সাহেব, আপনি লেখায় যতটা পটু। চেহারায় ততটা নয়। আমার কাছে যে টাকা নেই, তা আপনার চেহারাই বলে দিচ্ছে।
-আর কিছু বলে কি এই চেহারা?
-পাঠকদের কাঁদাতে মজা পায়।
ইরা বুঝেও অবুঝের মত করছে। আমার মনে চলতে থাকা ঝড়টা দেখেও ইরা দেখে না। তবে কি আমাকে নিয়ে ইরা তেমন কিছুই ভাবে না!
জীবনের অন্যতম একটা দিন গেল আজ। নারী বিদ্বেষী আমি এখন ইরার আঁচলে বাধা পড়তে চাই।
রাত আটটায় ফোন আসে ভাইয়া, এক্সিডেন্ট করে সদর হাসপাতালে আছে। ফোনে চার্জ ছিলো না, তাই ফোন চার্জে দিয়েই সদর হাসপাতালে যাই। আমার বাসা থেকে সদর হাসপাতাল দশমিনিটের রাস্তা। আর যিনি এক্সিডেন্ট করছে, তিনি আমার ফুফাতো ভাই। হাসপাতাল থেকে এগারোটার দিকে বাসায় এসে ফেসবুকে ঢুকেই চোখ ছানাবানা। ইরা ছোট একটা পোস্ট করেছে। নির্মেলেন্দূ এর বলছি না ভালবাসতে হবে এর কয়েকটা লাইন। ট্যাগটা আমাকে। তার নিচের পোস্টটা আরও বড়সড় একটা বজ্রপড়ার মত। ইরা রিলেশনশিপ দিয়েছে আমার সাথে। সেখানে অনেক পাঠকই কমেন্টস করেছে। ছেলেরা অভিনন্দন জানালেও মেয়েরা মেনে নিতে পারেনি, তাই তো কেউ কেউ কটু ভাষায় কমেন্টস করেছে। ইরা আমাকে অনলাইনে দেখে কল দেয়। কান্না জড়িত কন্ঠে বলে..
-আমি দুষ্টুমি করার জন্য দিয়েছি, কিছু মনে করবেন না। আমি পোস্টটা ডিলেট করে দিচ্ছি।
-ইরা, তুমি আমাকে ভালবাসো?
-বললাম তো দুষ্টুমির ছুঁতে দিয়েছি।
-ইরা, জানো তোমার মনে আমার জন্য ভালবাসা আছে কি না এটা জানার জন্য কত দোটায় ছিলাম। তুমি মাঝখানে তিনদিন ছিলে না। ওই তিনদিনই, আমি আকন্ঠ দহনে পুড়েছি, পুড়েছি অশ্রু সিক্ত নয়নে। জ্বর আমার গা না পোড়ালেও তোমার না আসাটা হৃদয় পুড়িয়েছিলো। আজ একপশলা বৃষ্টি ছিটিয়ে তাও ফেরৎ চাইছো?
ইরা কোন কথাই বলেনি।
-ইরা, আমার গল্পের চরিত্র হবে, যে গল্পে কোন বিষাদ থাকবে না, রোমাঞ্চের চরম শিখরে থাকবে গল্পগুলো। সব গল্পই কথা বলবে আমাদের ভালবাসায় মাতানো দিনের কথা, রাতের কথা। শহরতলী কাঁপানো প্রেমের গল্প। আমার বৃদ্ধ বয়সের লাঠি হবে? যখন আমি হাঁটতে পাব না, তখন আমার দৃষ্টিহীন চোখের দৃষ্টি হয়েও। আর কিছু না! পারবে?
-সত্যিই আর কিছু না? এতটুকুন এ আমার যে পুষবে না! আমার আরও চাই। পৃথিবী উজার করা ভালবাসা চাই।
-পৃথিবীর সকল সুখ তোমার আমার হবে। তুমি শুধু আমার হও।
-হব তো পাগল। আমি তো তোমারই..
এভাবেই আমাদের ভালবাসার গল্পটা শুরু হয়।

Baaaaah Onek valo laghlo
ReplyDeleteMashallah onek boro likhlen
ReplyDeleteThanks a lot
Delete